• আমিন বাবু

দশাসই চেহারা থেকে কলমের আজকের জিরো ফিগারের যাত্রাটা রূপকথার গল্পের মতই। কুইল থেকে স্টাইলাস হয়ে ঝর্ণা কলম- তরল কালির সাথে হাতেনাতের সম্পর্ক বুঝি চুকে গেছে অনেককাল আগে। এখন তো ডটপেন বা বলপেনের রাজত্ব। অবশ্য লেখার প্রচল রীতি ভেঙে কি বোর্ডে হাত মকশ্ করার লোকই বেশি। এই দহনকালে সংহারগ্রস্ত মানুষের কাছে ফাউন্টেন পেন একটা মিথ!

মিথ ১: ফাউন্টেন পেন ব্যবহার হয় না।

আপনার হাতে ফাউন্টেন পেন দেখে হঠাৎ চমকে উঠলো আপনার সামনের মানুষটি। অশতীপর হলে বলবে- “এখন তো লেখার অভ্যাসই উঠে গেছে তারউপর আবার ফাউন্টেন পেন”! আর যদি কোনো কমবয়সীর নজর পড়ে কলমের দিকে তবে সে প্রথমত আকৃষ্ট এর ব্যতিক্রমী ও ফেন্সী লুকের কারণে। ঝর্ণা কলমের ইতিহাস জানা বেশিরভাগই কথার ছলে বলে থাকেন “ফাউন্টেন পেন এখন আর ব্যবহার হয় না”। একেবারেই হয় না সেকি বলা যাবে? কম হলেও তো ব্যবহার এখনো উঠে যায়নি। এখনো অনেকে এই কলম ছাড়া লিখতে পারেন না। এক্ষেত্রে কথা সাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক স্যারের কথা স্মরণীয়। ফাউন্টেন পেন কালচারের এক অনাড়ম্বর আড্ডায় তিনি জানিয়েছিলেন, তিনি ঝর্ণা কলম ছাড়া আজ পর্যন্ত কখনো কোনো লেখা লেখেননি।

মিথ ২: এই কলম খুব দামী।

৫০ টাকায় একটা মোটামুটি ভালো মানের ফাউন্টেন পেন পাওয়া যায়, যা দিয়ে বছরের পর বছর লেখা চালিয়ে নেয়া সম্ভব। এক দোয়াত কালি আর কলম সঙ্গী হলে দিস্তার পর দিস্তা লিখে সাবার করে দেয়া যায়। তবে হ্যাঁ, যারা উচ্চমূল্যের কলম চায়, তাদের জন্যও অপশন রেখেছে ফাউন্টেন পেন। লেখার জন্য ঝর্ণা কলমকে বলা হয় “এককালীন বিনিয়োগ”।

মিথ ৩: কালি লিক করে।

এটি ফাউন্টেন পেনের সবচেয়ে প্রচলিত মিথগুলোর একটি। বেশিরভাগ মানুষই অন্যের মূল্যায়ন বা কথাকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। তাই ব্যবহার ছাড়াই এই মিথে বিশ্বাস স্থাপন করতে দেখা যায়। অতীতে কোনো এককালে কালি লিক করার সমস্যা ছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো- প্রযুক্তির উন্নতির কারণে কোম্পানিগুলো সেই সমস্যা দূর করেছে। বর্তমান সময়ে সবচেয়ে সাধারণ কলমটিও উন্নত প্রযুক্তির মধ্য দিয়ে জন্ম নিয়ে থাকে। কেউ যদি বলে কালি লিক করার কারণে তিনি ফাউন্টেন পেন ব্যবহার করেন না তাহলে মিথ্যে বলা হবে। কোনো কোম্পানি এমন কলম বানাতে চায় না যেটা লিক করে। যদি কোনো ব্যবহারকারী এমন কলম পান তাহলে ধরে নিতে পারেন সেই কলমটি ঠিকমত ব্যবহার করা হচ্ছে না নতুবা কলমটা প্রোডাকশন লাইনে ত্রুটিপূর্ণ। প্রথমবার ফাউন্টেন পেন ব্যবহার করে এমন অভিযোগ অনেকেই তুলতে পারেন কিন্তু ভেবে দেখা দরকার আমরা যদি চিত্রকর্ম বানাতে যাই সেক্ষেত্রেওতো হাতে রং লাগতে পারে। এই রং লাগানো ছাড়া একজন নিজেকে শিল্পী বলতে পারে না। তাই বলা যায়, ফাউন্টেন পেন ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ সময়ের সাথে হয়ে যায়। বিমানে ভ্রমণের সময় এয়ার প্রেসার ওঠানামা, সঠিকভাবে কালি পূরণ না করা, অধিক ঝাঁকি অথবা ত্রুটিপূর্ণ কলম লিক হতে পারে। তবে এ সম্পর্কে যখন আপনার জানাশোনা হয়ে যাবে তখন আর কোন প্রতিবন্ধকতা থাকবে না কিংবা মিথও বিশ্বাযোগ্য মনে হবে না।

মিথ ৪: দ্রুত লেখে না।

বলা হয় Slow is Better ; হাঁটা শেখার পর পরই দৌড়ানোর অভ্যাস করতে হয়, তার আগে নিশ্চয়ই নয়। কালি, কলম ও কাগজের কেমিস্ট্রিটা বুঝে গেলে আর এই মিথটা আমলযোগ্য থাকে না। খেয়াল করে দেখুন, আমরা যখন পাহাড়ি রাস্তায় ড্রাইভ করবো তখন ধীর গতিতেই গাড়িটা চালাবো। কেননা আমার কাছে ওই পথের সৌন্দর্য উপভোগ করা একটা কারণ হয়ে দাড়ায়। এটা একটি মানসিক সংযোগও বটে। ফাউন্টেন পেনের ব্যাপারটাও তাই। এই কলম হাতে তুলে নেয়া মানেই আপনি গোটা প্রসেসটাকে এনজয় করছেন। তাই মানসিক সংযোগ স্থাপনের জন্য কলমকে সময় দিতে হয়। সঠিক নিব ও কাগজ বাছাই হলে ধীরগতির কোন কারণ নেই।

মিথ ৫: ফাউন্টেন পেন লাক্সারি এটা কোন প্রয়োজন নয়।

আপনি যদি একজন সংগ্রাহক হন তাহলে একটার পর একটা কলম কিনবেন এবং সেটা ধরে রাখবেন, জমাবেন। এক্ষেত্রে ফটোগ্রাফি বা ট্রাভেলিংয়ের মতই একটা শখ হিসেবে বিষয়টা দাড়িয়ে যাবে। অবশ্য এই দুইয়ের তুলনায় কলমের শখ নিতান্তই সুলভ বলা যায়। অন্যদিকে যদি আমি ভাবি সারাজীবন লেখার জন্য একটা কলম কিনবো তাহলে তো দুশো টাকার একটা কলমই যথেষ্ট। এখনকার দিনের একটা ফাউন্টেন পেন অবলীলায় ১০/২০ বছর চালিয়ে দেয়া যায়। কিছু কিছু তো লাইফটাইম গ্যারান্টি। উল্টোদিকে আপনি যদি সারাজীবন কেনা বলপেনের সাথে অর্থের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করেন তাহলে ফাউন্টেন পেনকে কিন্তু স্বস্তাই মনে হবে। তাই আপনি যদি এটি একটি ব্যয়সাপেক্ষ ব্যবহার তবে আমি বলবো – না। কিন্তু আপনি যদি বলেন এই ব্যবহারকে ব্যায়সাপেক্ষ শখ বা লাক্সারিতে রূপান্তর করা যায় কিনা, তাহলে আমি বলবো- হ্যাঁ। কলমের ক্ষেত্রে এ প্রসঙ্গে একটা কথা বলা যায়, “যদি একটা কলম আপনার জন্য যথেষ্ট না হয়, তাহলে হাজার কলমেও মন ভরবে না আপনার”।

মিথ ৬: হাই মেইনটেনেন্স।

আবারও দৃষ্টিভঙ্গির কথা চলে আসে। কেউ যদি বলে রক্ষণাবেক্ষণ করা খরচসাপেক্ষ, আমি বলবো- না। তবে কেউ যদি বলে সময়সাপেক্ষ, তাহলে আমি বলবো- হ্যাঁ। বলপেন ছুড়ে ফেলে দেয়া যায় কিন্তু ফাউন্টেন পেন যেহেতু আপনার পারসোনালিটিও দেখায় সুতরাং আপনি একে আপনি ফেলে দিতে পারেন না। তাই কালি শেষ হলে রিফিল করা হয়। দীর্ঘদিন ব্যবহার না করলে ধুয়ে পরিস্কার করে তুল রাখার ব্যবস্থা করতে হয়। মোট কথা এসবই কালি, কলম ও কাগজের আদবকেতা; যা লেখার পুরো প্রক্রিয়াটার অংশ। একটা সংস্কৃতি।

মিথ ৭: বহন সহজ নয়।

বলপেনের তুলনায় একটি ফাউন্টেন পেন অধিক মনযোগ দাবি করে। তাই একে বহনের জন্য অনেকেই বাড়তি সতর্কতা বা নজর দেন। একেই অনেকে বাড়তি ঝামেলা মনে করেন।

মিথ ৮: বাম হাতে লেখা যায় না।

এখন আধুনিক যুগ। সঠিক নিব ও কালি নির্বাচন করলে এটা কোনো সমস্যাই না। দ্রুত শুকিয়ে যায় এমন কালি দিয়ে বাম হাতের লেখকরা কাজ চালিয়ে নিতে পারেন অনায়াসে। এক্ষেত্রে কিছু বিষয় জানা দরকার। আপনার হাতের লেখা যদি ছোট হয় তাহলে আপনি মোটা Tip বা M নিব ব্যবহার করবেন না। আপনার হস্তাক্ষর যদি বড় হয় তাহলে F নিবের ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন। আপনি খুব ধীর গতির লেখক হলে আপনার জন্য B বা BB নিব নয়। সুতরাং দেখা যাচ্ছে একটা ফাউন্টেন পেনে অপশন বেশি বৈচিত্রও বেশি। প্রতিটি মানুষের নিজস্বতাকে গুরুত্ব দেয়া হয় এই কলমে। কাউকে একটি নিবে ধাতস্থ হতে বাধ্য করলে তার ন্যাচারাল রাইটিং বিউটিটা হারিয়ে যাবে। তাই গাইডলাইন ফলো করে লিখলে এসব ছোটখাটো ইস্যু আর সামনে আসবে না।

মিথ ৯: হাতের লেখা ভালো না হলে ফাউন্টেন পেন ব্যবহার নিষেধ।

এই মিথের বরং উল্টোটা বলা যায়। কেননা, ফাউন্টেন পেন দিয়ে লেখার সময় মনযোগ, স্থীরতা আসে। গ্রাভিটি সিস্টেমের এই ধরণের তরল কালির কলম তার বডির ওজনের মাধ্যমেই লেখা লিখতে সক্ষম সেক্ষেত্রে আপনাকে কেবল লাইনগুলো গাইড করতে হয়। তাই যারা হাতের লেখা ভালো করতে চায় তাদের জন্য ফাউন্টেন পেনের বিকল্প নেই। গবেষণায় দেখা গেছে একটা বয়সের (৪০ থেকে ৫০ বছর) পর থেকে বলপেন ব্যবহার স্বাস্থ্যের জন্য বেশিরভাগ মানুষের জন্যই ক্ষতির কারণ হতে পারে। কেননা যারা নিয়মিত ও বেশি লেখেন তাদের আঙ্গুলে কলমটা ধরে কাধের একটা চাপ বা প্রেসারে লিখতে হয়। এই চাপ হলো ব্লাডপ্রেসারের চাপ। তাই বাড়তি চাপে লেখার ফলে আর্থ্রাইটিস হতে পারে। এই ধরণের Health Hazard দূর করতে ফাউন্টেন পেনের জুড়ি নেই।

মিথ ১০: প্রতিদিনের ব্যবহারযোগ্য নয়।

এখন আপনি যদি নিউজপেপারে সুডুকু বা ক্রসওয়ার্ড পাজল মেলাতে চান বা ট্রাভেল টাইপ (কুরিয়ার, ডেলিভারি সার্ভিস) জব করে থাকেন তাহলে আপনার জন্য এই কলমের এক্সট্রা ফাইন বা খসখসে নিব ব্যবহার করতে হবে। নতুবা প্রতিদিন মিডিয়াম বা ব্রড নিব দিয়ে লিখতে কষ্টকর হবে। এছাড়া কার্বন পেপার বা ব্যাংক ডকুমেন্টের অনেক কাগজেই তরল কালির কলম ভালো কাজ করবে না। এর একটা কারণ হলো বলপেনে যে পরিমান প্রেসার দিয়ে লিখতে হয় তা ফাউন্টেন পেনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

মিথ ১১: একই কোম্পানির কালি ব্যবহার করা উচিত।

বর্তমানকে বলা হয়ে থাকে “আউটসোর্সিংয়ের যুগ”। বিশ্বের হাতেগোনা কয়েকটি কোম্পানি ছাড়া বাকিরা কালি বানায় না। তারা কেবল চায়না ও ইন্ডিয়া থেকে কালি আউটসোর্স করে থাকে। অনেকে আবার প্রিন্টিংয়ের কালি বানানোর অভিজ্ঞতা থেকে ফাউন্টেন পেনের কালি বানিয়ে থাকে। কাজেই পেলিকেনের কলম হলে যে পেলিকেনের কালি ব্যবহার করতে হবে এটা ভুল। বিশ্বজুড়ে হাতে বানানো পুরনো ফর্মূলার কালি অদিক সমাদৃত এই কারণে। কেননা বর্তমান উচ্চমাত্রার রাসায়নিক কালির তুলনায় অতীতের ফর্মূলায় বানানো প্রকৃতি বান্ধব কালিই কলম ও লেখনির জন্য ভালো।

মিথ ১২: দামী কলম মানেই উচ্চমানের লেখনী।

কী কাজে ব্যবহার হচ্ছে কলমটা? যদি শুধু সিগনেচার পেন হয়ে থাকে তাহলে এখানে লেখার অভিজ্ঞতা আমলে নেয়া যাবে না। আর যদি দীর্ঘ সময় লেখা হয়ে থাকে তাহলে সাইড টু সাইড কম্পেয়ার করে দেখা যেতে পারে। কেননা দেখা গেছে লাখ টাকার একটা কলমের চেয়ে হাজার টাকার একটা কলম অনেক ভালো পারফরমেন্স দেয়।

মিথ ১৩: স্টিল নিবের চেয়ে গোল্ড নিব ভালো।

এটা সর্বৈব মার্কেটিং মিথ। ভালো শব্দটা যেহেতু আপেক্ষিক সেহেতু দেখতে হবে এখানে ভালো বলতে কী বোঝানো হয়েছে। গোল্ড নিব দীর্ঘস্থায়ী ও দামি এই অর্থে ভালো বোঝানো হলে অবশ্যই স্টিল নিবের চেয়ে সবসময় এগিয়ে। তবে গোল্ড নিব স্টিল নিবের চেয়ে ভালো লিখবে এটা সবসময় সত্যি নয়। স্টিল নিবে ভালো Tip Point ব্যবহার করার কারণে পারফরমেন্সে অনেক সময় সোনার কলমকেও পেছনে ফেলে দেয়। প্রযুক্তির ব্যবহারের কারণে স্টিল নিবের কলমকেও আজকাল উচ্চমাত্রা দেয়া যাচ্ছে।

One Reply to “ফাউন্টেন পেন মিথ”

  1. এতো সুন্দর করে গুছিয়ে লেখা হয়েছে পুরোটা। অনেক প্রয়োজনীয় তথ্য তুলে ধরা হয়েছে যা একদম বিগিনিয়ার থেকে শুরু করে সবার জন্য উপকারী। ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *