ফাউন্টেন পেন বড্ড সেকেলে! ও ব্যাটা এখনও জাত পাতের গণ্ডি পেরোতে পারেনি। হাড়ে হাড়ে বজ্জাত। এই যে, এত জাতের বাহারি কলম! এক জীবনে তার সব একজন মানুষের পক্ষে কি ব্যবহার সম্ভব? তারপরও নিত্যনতুন চটক চোখ রাঙিয়ে দিচ্ছে!! এরমাঝে কিছু কলম খুব প্রিয় হয়ে ওঠে তার পারফরমেন্সের কারনে, কোনোটি আবার নির্বিকার পড়ে থাকে। একে আমরা বলছি- ভালো কলম আর খারাপ কলম!

How do you make out a good pen or a bad pen? প্রশ্নটা করা হয়েছিল ডা. পেন নামে খ্যাত ভারতের ফাউন্টেন পেন ক্রিটিক ডা. হারপ্রিত কোচারকে। তার অনলাইন সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন নিধি। এখানে তার চুম্বক অংশ ভাষান্তর করা হলো।

ডা. কোচার : এটা খুবই কৌশলধর্মী একটা প্রশ্ন। বিষয়টিকে যথার্থ দৃষ্টিতে দেখা যাক- একজন ব্যবহারকারী বা সংগ্রাহক হিসেবে প্রতিদিন নানা ধরণের কলম হাতে নিচ্ছি আমরা। ক্রমশ বয়স বাড়ছে আর আমাদের পছন্দের পরিবর্তন ঘটছে। ফাউন্টেন পেন ব্যবহার বা সংগ্রহের শুরুতে আমাদের পছন্দগুলো থাকে একরকম আর সময়ের সাথে তা পাল্টে হয়ে যায় ভিন্ন। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, সময় বা টাইম আমাদের রুচি ও পরিপক্কতায় বড় ভূমিকা রাখছে। এই যে বয়স/সময়/কালের সাথে পছন্দের বদল হয় তার কেতাবী নাম Benchmark! সময় একটি বেঞ্চমার্ক বা সূচক নির্ধারণ করে কিংবা একটি স্ট্যান্ডার্ড সেট করে। সাধারণত একটি কলমের ম্যাটারিয়াল, রাইটিং এক্সপেরিয়েন্স, নিব, ফিড, বিল্ড কোয়ালিটি, ওয়েট, ব্যালেন্স, লুক, ফিলিং ম্যাকানিজম, বহনযোগ্যতা ও কত সহজে পরিস্কার করা যায় এসব নানা বিষয়ের উপর নির্ভর করে বেঞ্চমার্ক ঠিক করি আমরা। এই সূচকেই তুলনা করি আমাদের পূর্বতন অভিজ্ঞতাকে। আগে যে কলম দিয়ে লিখেছি তার সাথে হাতে পাওয়া নতুন কলমটাকে সাইড বাই সাইড মেপে দেখি।

লং রাইটিং বা দীর্ঘসময় লেখা এবং স্বল্প সময় ব্যবহার উপযোগীতা- এই দুই ধরণের ব্যবহারকারী বেঞ্চমার্ক নির্ধারণ করে একটি কলম সম্পর্কে মন্তব্য করতে পারেন। এছাড়া যারা সংগ্রাহক রয়েছেন এবং রিসেল ভ্যালুর ইউজার বা যারা কিছুদিন পর কলম বিক্রি করে দেন তারাও নিজেদের মত এই কলমগুলোকে ভালো বা মন্দ হিসেবে অভিহীত করেন। তাহলে কথা হচ্ছে, সময়ের সাথে সাথে যদি পছন্দের সূচক বা বেঞ্চমার্ক বদলাতে থাকে তবে কীভাবে আমরা একটি জড় বস্তুকে ঢালাওভাবে ভালো বা খারাপ বলতে পারি? আজ যা চূড়ান্ত ভালো মনে হচ্ছে তা কিছুদিন পর ফালতু ঠেকছে। আজ হয়তো ল্যামি সাফারি বেস্ট পেন এভার মনে হচ্ছে। অন্য একজন যখন ওই দামের আরেকটি কলমকে তার বেস্ট পেন বলছে সেটা আপনার কাছে গ্রহণযোগ্য নাও মনে হতে পারে। আবার এমনও হয়, অন্য একজন আপনার পছন্দ দেখে মুচকি হেসে ভাবছে- “ওরে… ম-ব্লা বা পেলিকেনে আয় বাবা, তাহলে মুখে আর কিছু রুচবে না”। তাই ভালো কলম ও খারাপ কলমের এই বিতর্ক সাধ, সাধ্য আর সামর্থ্যের।

আবার দেখা যায় এখন আপনার যে বয়স সে অনুযায়ী ল্যামি সাফারির গ্রিপ ও বিল্ড কোয়ালিটি মানানসই। বয়স বাড়ার সাথে আপনার একটু ভারি ও বড় সাইজের কলম পছন্দ হতে শুরু করলো। সুতরাং সময় অনুযায়ী এই যে বেঞ্চমার্ক পরিবর্তন হচ্ছে সেটাকে সমীহ করলেই ফাউন্টেন পেনের প্রতি সমীহ করা হবে। কাজেই ভালো বা খারাপ শব্দযুগল এক্ষেত্রে মনে হয় সমীচিন নয়। ফকির লালনের ভাষায়- একেদেশে যা পাপ গণ্য, অন্যদেশে পূণ্য তাই। একেকটা ফাউন্টেন পেন তার দাম ও মান নিজস্বতায় নির্ধারণ করে থাকে কোম্পানিগুলো। প্রতিটি কলম তার নিজস্ব বৈশিষ্ট সহযোগে বানানো হয়। এরমধ্যে কোনো কলমের বৈশিষ্ট আমার পছন্দ নাও হতে পারে বা আমার রুচির সাথে অমিল ঘটাতে পারে। তাই বলে তাকে খারাপ বলার পক্ষে নই আমি।

অনেক সময় বিক্রেতা অধিক মূল্যে কোম্পানির পণ্য আমাদের দেশে (ভারত) বিক্রি করে যদিও সে পণ্যের দাম কোম্পানিটি ততটা নির্ধারণ করেনি, তাই দামের সাথে পণ্যের তুলনায় সে কলম আমি পরিত্যাগ করতে পারি; ক্রেতা হিসেবে সে অধিকার আছে। কিন্তু সেই কলমের ষোল আনা খারিজ করার যৌক্তিকতা কী? তবে হ্যাঁ, কোনো কলম যদি প্রোডাকশন লাইন থেকে ফল্টি হয় সেই কথা আলাদা। সেক্ষেত্রে তাকে অবশ্যই খারাপ কলম বলতে হবে।

নিধি : তারমানে আমরা খারাপ কলম বা কালি ক্রয় করি না।

ডা. কোচার : আমরা যা অপছন্দ করি তা সাধারণত ক্রয় করি না। সুতরাং যে পণ্য আমি পছন্দ করছি তাই যদি কিনে থাকি তাহলে নিজ পছন্দের জিনিষকে খারাপ বলবো কেন। হিউম্যান সাইকোলজি বলে – মানুষ কখনোই তা করে না। বরং ওই কলম বা কালিকে মানসম্পন্ন মনে না করলেও সে ওই পণ্যের ইতিবাচক দিকগুলি খোঁজার চেষ্টা করে।

নিধি: কালেক্টর, ইউজার ও একজন অ্যাকুম্যুলেটরের মধ্যে তফাৎ কী?

ডা. কোচার : User– একজন ব্যবহারকারীর টার্গেট থাকবে খুবই সাধারণ। সরাসরি তিনি কিনবেন এবং শুধুমাত্র ব্যবহারেই মনযোগী হবেন। ইউজার এমন কিছু কিনবেন না যা তিনি ব্যবহার করতে পারবেন না। কারণ ব্যবহারের বাইরে কোন কিছু তিনি ফেলে রাখতে চান না। ইউজারকে তার ডিজায়ার কন্ট্রোল করতে জানতে হয়। তিনি কোনভাবেই অসহিষ্ণু হবেন না বা উচ্চাকাঙ্খা পোষণ করবেন না।  

Collector –  একজন ফাউন্টেন পেন কালেক্টর মানে আদতে সে ধনী, সেনসেবল ও প্রফেশনাল জ্ঞান সমৃদ্ধ ব্যক্তি হবেন। তিনি এক বা একাধিক লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাবেন। একজন মানুষের পক্ষে সব ফাউন্টেন পেন সংগ্রহ সম্ভব নয়। বিষয়টি মাথায় নিয়েই নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সংগ্রহ করার চেষ্টা করেন একজন কালেক্টর। হাতের সামনে যা পাবেন তাতেই পয়সা খরচ করা তার স্বভাব হবে না। তিনি জ্ঞান দ্বারা পরিচালিত হবেন এবং অর্থদ্বারা সাধ পূরণ করবেন। কালেক্টর চান তার স্বীকৃতি। তাই তিনি এসব দেখিয়ে আনন্দ পাবেন এবং সবার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করবেন। 

Accumulators – একজন আহরণকারী; টার্গেটবিহীন ব্যক্তি। সাধারণত তিনি সবকিছু মজুত করতে পছন্দ করেন। এটা এক ধরণের রোগ। এদের কোন এক্সিট প্ল্যান থাকে না। অন্যের দেখাদেখি তারা অর্থ খরচের উৎস তৈরি করেন এবং কলমকে শুধুমাত্র বিলাসী পণ্য হিসেবেই গণ্য করেন। তিনি তার নিজের জন্য ডিজায়ার ক্রিয়েট করে। ফাউন্টেন পেনের ব্যবহার ও উপযোগিতা সম্পর্কে জানা কিংবা জ্ঞান লাভে এই ধরণের ব্যক্তির আগ্রহ থাকে না। শখের এই পর্ব একজন এ্যাকুম্যুলেটরের জন্য ডেড অ্যাসেটের জন্ম দেয়।

মূল : Nithi

ভাষান্তর : আমিন বাবু

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *